হাইস্কুল লাইফ

ফিরে দেখা
-----------------
হাইস্কুল লাইফ:
বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব আনুমানিক ২.৫ কিঃমিঃ হবে। এই রাস্তাটুকু আমাকে হেটেই যেতে হত। অনেক ঘ্যানর ঘ্যানর করে আম্মার থেকে ৫/৬ টাকা নিতাম টিফিনের জন্য, এই টাকা বাস অথবা রিক্সা ভাড়ার পিছনে খরচ করা একেবারেই বোকামি। টিফিনের জন্য টাকা সেইভ করতে প্রায় প্রতিদিনই হেটে যাওয়া আসা করতে হত। অবশ্য আমাদের গ্রামের ১০/১২ জন ছেলে মেয়ে একসাথে গল্প করতে করতে কখন যে চলে আসতাম টেরই পাইতামনা। তখনো স্কুলের ব্যাগ আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। ক্যালেন্ডারের পাতায় বাধানো ৫/৬ টা মেইন বই, বাংলা, অংক, ইংরেজির ৩ টা মোটা খাতা,এবং জ্যামিতি বক্স একসাথে হাতে করে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে অনেক কষ্ঠ হত! অবস্য এখন বুঝি ঐ হাটার অভ্যাস এখনো আমার মধ্যে আছে। এখনো আল্লাহর রহমতে দৈনিক ২/৪ ঘন্টা হাটতেও তেমন সমস্যা হয় না।
লেখাপড়ায় আমি মোটামুটি সিরিয়াস টাইপের ছিলাম, শুধু পাটিগণিতে কিছুটা দুর্বল ছিলাম। সরল অংকের প্যাচ, চলতি নিয়ম, ঐকিক নিয়ম এবং চৌবাচ্চার অংকের মারপেঁচে লাইফ টা মাঝেমধ্যে তামাতামা হইয়া যাইত! মনে পড়ে, নবম-দশম শ্রেণির ত্যাদর বানরের সেই দুর্বোধ্য অংক-"একটি তৈলাক্ত বাঁশ বাহিয়া, একটি বানর ১ম মিনিটে ৩ মিটার উঠিয়া যায়। কিন্তু ২য় মিনিটে ২ মিটার নিচে নামিয়া যায়। বাঁশটির উচ্চতা ৫০ মিটার হলে, বানরটির বাঁশের আগায় চড়িতে কত সময় লাগিবে?" এই অংক পিপিলিকার মত মাথায় ঢুকে টুকটুক কামড়ে আমারে পাগলপ্রায় করে দিত! বানর আর তৈলাক্ত বাশের চিন্তায় চিন্তায় জীবনটাই তৈলাক্ত হইয়া যাইতে লাগল! অনেক চেস্টা সাধনার পরও অংকটা মাথায় ঢুকাতে না পেরে শেষমেশ মুখস্থ করে ফেললাম, তারপরও পরিক্ষায় এই অংকটা করতে গেলেই আমার মস্তিষ্ক আমার সাথে খাড়ার উপড় বেইমানি করে ফেলত! অনেকটা ভাগ্যের জোড়ে কোন এক টার্ম পরিক্ষায় অংকটা মিলিয়েই ফেললাম, সে এক বিশাল ফ্যান্টাসি! মনে হইল হিমালয় জয় করছি!
হাইস্কুল লাইফের প্রথম প্রাইভেট শুরু করলাম ইংরেজি দিয়ে-তুখোড় এক সিনিয়র ইংরেজি টিচার এর কাছে মাসিক ১০০ টাকায়। অবস্য তার কাছে না পড়ে উপায় ছিলনা! কারন ওনার কাছে প্রাইভেট না পরার কারনে সামান্য একটা বানানের ভুলের কারনে একদিন বডির সামনে এবং পশ্চাদদেশে ২/৩ টা বেত্রাঘাত খাইতে হল! শান্তিমত পিটুনির পর মাথাটা আমার দিকে সামান্য ঝুকাইয়া বলল "ইংরেজি পারবি কিভাবে? ইংরেজি এত সোজা না, এই সাবজেক্টে ভাল করতে হলে প্রাইভেট পরতে হবে, বুঝছিস? আমার কাছে প্রাইভেট শুরু কর, ইংরেজিতে সাগর বানিয়ে দিব।" ঠিক ঐদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম ওনার কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে, নাহলে এভাবে মাইর খাইতে হবে! স্কুলে যাওয়ার আগে ভোর ৭ টায় স্যারের বাসায় চলে যেতাম প্রাইভেট পড়তে। মাঝে মধ্যে উনি স্টুডেন্ট দের দিয়ে বাড়ির হালকা পাতলা কাজও করিয়ে নিতেন! আর একদিন স্যার আমাদের দিয়ে বাড়ির পাশের ছোট একটা গর্ত থেকে মাছ ধরিয়েছিলেন! ইংরেজি শিখতে গিয়ে মাছ ধরে ফিরলাম! এক্সেপশনাল অভিজ্ঞতা! ওনার এসব আজব কান্ড কারখানা আমার কাছে মজাই লাগত! খুব এঞ্জয় করতাম! একদিন লেইজার পিরিয়ডে স্কুলের পাশেই মরম আলির চা দোকানে গেলাম চা দিয়ে খাস্তা খাইতে, যাইয়া দেখি স্যার ঐ দোকানে বইসাই চা খাচ্ছে, আমাকে দেখেই বলল, "শোন কালকে আমার একটু কাজ আছে, পড়াতে পারবনা, কালকের পড়াটা এখনি পইড়া নে, আমিত পুরাই টাস্কি খাইয়া গেলাম!" বললাম স্যার এই দোকানে পড়াবেন? স্যার বললেন, "শোন, পড়ার জন্য প্লেসটা ইম্পর্টেন্ট না, ইচ্ছেটাই ইম্পর্টেন্ট!" পকেটা থেকে বাজার খরছের লিস্ট এর একটা কাগজ বের করে বললেন "কাগজের উল্টো পাশে ট্রান্সলেশন লিখ- ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদির তীরে অবস্থিত।" কি ট্রান্সলেশন করব, বারবার চোখ চলে যাচ্ছে ত্রিভুজাকৃতির কেক এর দিকে, পকেটে টাকাও শেষ। দুইটা ট্রান্সলেশন করার পর অনেকটা সাহস কইরা বলে ফেললাম স্যার কেক খাব, স্যার এর পান চাবানো হটাত থাইমা গেল, চোখ দুটু কমলা লেবুর মত গোল হইয়া গেল! কিছুক্ষণ একদৃস্টিতে তাকিয়ে থাকার পর বলল-"এইসব কেক বাজে মাল দিয়ে বানান, খাইওনা পেট খারাপ করতে পারে!" দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চা দোকানের ভিতরেই ঐ দিনের প্রাইভেট শেষ করলাম!
আর একদিন স্কুল ছুটির পর আমাকে যারপরনাই অবাক করে দিয়ে স্যার বলল- আমার সাইকেলে পিছনে বস, তোকে তোর বাড়িতে নামাইয়া দিয়া আমি বাসায় চলে যাব, যেতে যেতে আজকে তোকে টেন্স শিখাব।" আমি মনে হয় গাছের থাইকা পড়লাম! যাক, উপায়ান্তর না পাইয়া স্যারের ফনিক্স সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসলাম, স্যার বলল "আই গো, কোন ট্যান্স? আই এম গোয়িং কোন টেন্স? গ্রামের খানাখন্দে ভড়া রাস্তার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে স্যার আমাকে ইংরেজিতে সাগর বানাইতে লাগলেন। ঐ দিনের স্মৃতি আমি কখনোই ভুলতে পারবনা। তবে এটা ঠিক, স্যারের হাতেই আমার ইংরেজি শিখার উল্লেখযোগ্য অধ্যায়টা রচিত হয়েছিল। স্যার কে অনেক মিস করি। আজীবন মিস করব।

Comments

Popular posts from this blog

Git

First-Time Git Setup

Git Install