প্রত্যাশা, ভয় ও জ্ঞান
প্রত্যাশা, ভয় ও জ্ঞান
এক সুফী দরবেশ, যখন মৃত্যুশয্যায় তার এক সহচর জিজ্ঞেস করল, হে সুফী দরবেশ, "কে আপনার গুরু?" উত্তরে সুফী দরবেশ বলেন, " উহু তার আর দরকার নেই, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সময় খুব অল্প। আমি শীঘ্রই মারা যাচ্ছি।" প্রশ্নকর্তা তবুও আবার প্রশ্ন করলেন, "শুধু নামটি যদি বলেন। আপনি এখনও জীবিত, আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস আছে, আর আপনি তো কথাও বলতে পারছেন।" তিনি বলেন, "এর উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। কারণ আমার গুরুর সংখ্যা হাজারের উপর। শুধুমাত্র তাদের নাম বলতেই মাস লেগে যাবে। আসলেই খুব দেরি হয়ে গেছে। তবে আমি আমার তিনজন গুরুর কথা অবশ্যই বলব। "
প্রথমজন এক চোর। অনেকআগে একবার আমি মরুভূমিতে হারিয়ে যাই। এরপর যখন আমি একটি গ্রামে এসে পৌঁছাই তখন গভীর রাত। বাজারের দোকান, সরাইখানা সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় কোন জনমানুষ নেই। আমি কথা বলার জন্য কাউকে খুঁজছিলাম। কিছুক্ষন পর রাস্তায় একজনের দেখা পেলাম। সে একটি বাড়ির দেয়ালের পার্শে রাস্তার উপর একটি গর্ত খুঁড়ছিল। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আজ রাতের জন্য আমি কি কোথাও আশ্রয় পেতে পারি? সে আমাকে বলল, আমি একজন চোর, আপনাকে দেখে সুফী দরবেশ মনে হচ্ছে। এই গভীর রাতে থাকার জন্য কোন থাকার জন্য কোন জায়গা বের করা খুব মুশকিল, আপনি আমার ঘরে আসতে পারেন। আপনি আমার সঙ্গে রাত্রি যাপন করতে পারেন, যদি আপনার এক চোরের সাথে থাকার মর্জি হয়।"
আমি দ্বিধাগ্রস্থ হলাম। তারপরই মনে হলো, যদি এক চোর সুফীকে ভয় না পায়, এক সুফী কেন চোরের জন্য ভীত হবে? প্রকৃতপক্ষে আমাকে দেখে তারই তো ভীত হওয়া উচিত। তাই আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি অবশ্যই রাজি আছি।" তারপর চোরের সঙ্গে গেলাম এবং তার বাড়িতে রাত্রি যাপন করলাম। সেই চোরটি ছিল মানুষ হিসেবে অতি চমৎকার, অতি উত্তম। আমি সেখানে এক মাস ছিলাম। প্রতিরাতে সে আমাকে বলতো, "এখন আমি কাজে যাচ্ছি। আপনি বিশ্রাম করুন। আপনি আপনার প্রার্থনা করুন। আপনি আপনার কাজ করুন।" যখন সে ফিরে আসতো, আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, আজ তোমার কিছু কি মিলেছে?" সে উত্তর দিতো, নাহ, আজ রাতে কিছুই মেলেনি। আগামীকাল আমি আবার চেষ্টা করবো।" এবং তার মধ্যে কখনই কোন হতাশা কাজ করতো না।
যদিও প্রতিরাতেই সে খালি হাতে ফিরতো কিন্তু সে সব সময় সুখী ছিল। সে বলতো, আমি আগামীকাল আবার চেষ্টা করবো, আর ঈশ্বরের কৃপায় কিছু পাবো। তুমি কিন্তু অবশ্যই আমার জন্য প্রার্থনা করবে।" অন্ততপক্ষে তুমি তো বলতে পারো, হে ঈশ্বর এই দরিদ্রকে তুমি সাহায্য কর।"
এরপর সুফী দরবেশ বলে গেলেন, যখন আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর প্রার্থনা করছিলাম, কিন্তু কোন ফল পাচ্ছিলাম না, মনে হচ্ছিল এই সকল প্রার্থনা আসলে আমার পাগলামি, আমি হতাশ হলাম। ঈশ্বর বলে আসলে কিছু নেই - ঠিক তখনই আমার চোরটির কথা মনে পরে গেল, সে প্রতি রাতেই বলতো, ঈশ্বরের কৃপায় আগামীকাল আমি কিছু পাবো।
তাই আমি আর একবার চেষ্টা করলাম। যদি এক চোর যদি আশাবাদী হয়, সেই বিশ্বাস রাখতে পারে, আমার অন্তত আর একদিন বেশি চেষ্টা করা উচিত। এই রকম অনেকবারই হয়েছে কিন্তু এবার চোরের কথা মনেকরে আরও একদিন আমি প্রার্থনায় বসলাম। এবং সেইদিন সত্যিই কিছু একটা হলো। আমি মাথা নত করলাম এক চোরের বাড়ির দিকে যদিও সে তখন আমার থেকে হাজার মাইল দূরে। সেই হচ্ছে আমার জীবনের প্রথম গুরু।
আমার দ্বিতীয় গুরু হচ্ছে এক কুকুর। সেদিন আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম। ক্লান্ত হয়ে এক নদীর কিনারে পৌঁছালাম। পিছে পিছে এক কুকুর চলে এলো। সেও তৃষ্ণার্ত ছিল। সে নদীর ধারে গেল, নদীর শান্ত জলে সে তার প্রতিবিম্ব দেখলো। সে চিৎকার দিল। প্রতিবিম্বও চিৎকার দিল। সে ভয়ে পিছিয়ে গেল। দিনটি ছিল প্রচণ্ড গরম আর কুকুরটি এতো বেশি তৃষ্ণার্ত ছিল যে সে পিছিয়ে যেতে দ্বিধাগ্রস্থ ছিল। সে আবার ফিরে এলো এবং জলের দিকে তাকালো। সে আবার তার প্রতিবিম্ব দেখলো। কিন্তু তার তৃষ্ণা এতো বেশি ছিল যে হঠাৎ করে জলের মধ্যে লাফ দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবিম্বটি চলে গেল। সে জল পান করলো। তারপর কিছুক্ষন জলে সাঁতার কাটলো। আমি দেখছিলাম। আমি বুঝলাম ঈশ্বর আমাকে বার্তা পাঠিয়েছেন - সকল ভয় সত্ত্বেও সেখানে লাফ দিতে হবে। যখন আমি অপরিচিত কোন সীমানায় লাফ দিতে যাই, ঠিক একই রকম ভয় আমার মাঝেও কাজ করে। আমি তার খুব কিনারে যাই, দ্বিধান্বিত হই, তারপর ফিরে আসি। তখন আমার কুকুরটির কথা মনে হয়। যদি এক কুকুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেই পরিস্থিতিকে, কেন আমি নই? একদিন আমিও আমার অজানা ভয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার অজানা ভয় আমাকে পেছনে গেলে চলে গেল। সেই কুকুরটি হচ্ছে আমার দ্বিতীয় গুরু।
আমার তৃতীয় গুরু হচ্ছে এক ছোট্ট বালক। আমি একবার এক শহরে পৌঁছালাম। সেখানে দেখলাম এক ছোট্ট বালক একটি জ্বলন্ত মোমবাতি তার হাতের মধ্যে লুকিয়ে মসজিদের দিকে যাচ্ছে সেখানে সে বাতিটি রাখবে বলে। মজা করেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি নিজে বাতিটি জালিয়েছো?" সেই বালকটি বলল, "জ্বি, মহাশয়।" আমি তাকে আবার মজা করে বললাম, "তুমি কি বলতে পারো এই আলো কোথায় থেকে আসে? একটা সময় ছিল যখন মোমবাতিটি নেভানো ছিল, তারপর একটা সময় মোমবাতিটি জ্বালানো হলো, তুমি কি আমাকে বলতে পারো এই আলোর উৎস কোথায় যেখান থেকে এই আলোক ছড়ায়? তুমি যেহেতু এটি জ্বালিয়েছো তুমি নিঃশ্চয় বলতে পারবে এর সঠিক উত্তর।" বালকটি হেসে দিল, তারপর সে এক ফুঁ দিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, এখন তুমি দেখেছো আলো চলে গেল, কোথায় চলে গেল ? তুমি বলো। আমার অহং ধ্বংস হলো। সেই সাথে আমার জ্ঞানও হলো চূর্ণবিচূর্ণ। সেই মুহূর্তে আমি আমার নিজের অজ্ঞতা বুঝেছিলাম।
Osho: ”Secret of secrets“ অনুবাদ।
এক সুফী দরবেশ, যখন মৃত্যুশয্যায় তার এক সহচর জিজ্ঞেস করল, হে সুফী দরবেশ, "কে আপনার গুরু?" উত্তরে সুফী দরবেশ বলেন, " উহু তার আর দরকার নেই, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সময় খুব অল্প। আমি শীঘ্রই মারা যাচ্ছি।" প্রশ্নকর্তা তবুও আবার প্রশ্ন করলেন, "শুধু নামটি যদি বলেন। আপনি এখনও জীবিত, আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস আছে, আর আপনি তো কথাও বলতে পারছেন।" তিনি বলেন, "এর উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। কারণ আমার গুরুর সংখ্যা হাজারের উপর। শুধুমাত্র তাদের নাম বলতেই মাস লেগে যাবে। আসলেই খুব দেরি হয়ে গেছে। তবে আমি আমার তিনজন গুরুর কথা অবশ্যই বলব। "
প্রথমজন এক চোর। অনেকআগে একবার আমি মরুভূমিতে হারিয়ে যাই। এরপর যখন আমি একটি গ্রামে এসে পৌঁছাই তখন গভীর রাত। বাজারের দোকান, সরাইখানা সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় কোন জনমানুষ নেই। আমি কথা বলার জন্য কাউকে খুঁজছিলাম। কিছুক্ষন পর রাস্তায় একজনের দেখা পেলাম। সে একটি বাড়ির দেয়ালের পার্শে রাস্তার উপর একটি গর্ত খুঁড়ছিল। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আজ রাতের জন্য আমি কি কোথাও আশ্রয় পেতে পারি? সে আমাকে বলল, আমি একজন চোর, আপনাকে দেখে সুফী দরবেশ মনে হচ্ছে। এই গভীর রাতে থাকার জন্য কোন থাকার জন্য কোন জায়গা বের করা খুব মুশকিল, আপনি আমার ঘরে আসতে পারেন। আপনি আমার সঙ্গে রাত্রি যাপন করতে পারেন, যদি আপনার এক চোরের সাথে থাকার মর্জি হয়।"
আমি দ্বিধাগ্রস্থ হলাম। তারপরই মনে হলো, যদি এক চোর সুফীকে ভয় না পায়, এক সুফী কেন চোরের জন্য ভীত হবে? প্রকৃতপক্ষে আমাকে দেখে তারই তো ভীত হওয়া উচিত। তাই আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি অবশ্যই রাজি আছি।" তারপর চোরের সঙ্গে গেলাম এবং তার বাড়িতে রাত্রি যাপন করলাম। সেই চোরটি ছিল মানুষ হিসেবে অতি চমৎকার, অতি উত্তম। আমি সেখানে এক মাস ছিলাম। প্রতিরাতে সে আমাকে বলতো, "এখন আমি কাজে যাচ্ছি। আপনি বিশ্রাম করুন। আপনি আপনার প্রার্থনা করুন। আপনি আপনার কাজ করুন।" যখন সে ফিরে আসতো, আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, আজ তোমার কিছু কি মিলেছে?" সে উত্তর দিতো, নাহ, আজ রাতে কিছুই মেলেনি। আগামীকাল আমি আবার চেষ্টা করবো।" এবং তার মধ্যে কখনই কোন হতাশা কাজ করতো না।
যদিও প্রতিরাতেই সে খালি হাতে ফিরতো কিন্তু সে সব সময় সুখী ছিল। সে বলতো, আমি আগামীকাল আবার চেষ্টা করবো, আর ঈশ্বরের কৃপায় কিছু পাবো। তুমি কিন্তু অবশ্যই আমার জন্য প্রার্থনা করবে।" অন্ততপক্ষে তুমি তো বলতে পারো, হে ঈশ্বর এই দরিদ্রকে তুমি সাহায্য কর।"
এরপর সুফী দরবেশ বলে গেলেন, যখন আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর প্রার্থনা করছিলাম, কিন্তু কোন ফল পাচ্ছিলাম না, মনে হচ্ছিল এই সকল প্রার্থনা আসলে আমার পাগলামি, আমি হতাশ হলাম। ঈশ্বর বলে আসলে কিছু নেই - ঠিক তখনই আমার চোরটির কথা মনে পরে গেল, সে প্রতি রাতেই বলতো, ঈশ্বরের কৃপায় আগামীকাল আমি কিছু পাবো।
তাই আমি আর একবার চেষ্টা করলাম। যদি এক চোর যদি আশাবাদী হয়, সেই বিশ্বাস রাখতে পারে, আমার অন্তত আর একদিন বেশি চেষ্টা করা উচিত। এই রকম অনেকবারই হয়েছে কিন্তু এবার চোরের কথা মনেকরে আরও একদিন আমি প্রার্থনায় বসলাম। এবং সেইদিন সত্যিই কিছু একটা হলো। আমি মাথা নত করলাম এক চোরের বাড়ির দিকে যদিও সে তখন আমার থেকে হাজার মাইল দূরে। সেই হচ্ছে আমার জীবনের প্রথম গুরু।
আমার দ্বিতীয় গুরু হচ্ছে এক কুকুর। সেদিন আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম। ক্লান্ত হয়ে এক নদীর কিনারে পৌঁছালাম। পিছে পিছে এক কুকুর চলে এলো। সেও তৃষ্ণার্ত ছিল। সে নদীর ধারে গেল, নদীর শান্ত জলে সে তার প্রতিবিম্ব দেখলো। সে চিৎকার দিল। প্রতিবিম্বও চিৎকার দিল। সে ভয়ে পিছিয়ে গেল। দিনটি ছিল প্রচণ্ড গরম আর কুকুরটি এতো বেশি তৃষ্ণার্ত ছিল যে সে পিছিয়ে যেতে দ্বিধাগ্রস্থ ছিল। সে আবার ফিরে এলো এবং জলের দিকে তাকালো। সে আবার তার প্রতিবিম্ব দেখলো। কিন্তু তার তৃষ্ণা এতো বেশি ছিল যে হঠাৎ করে জলের মধ্যে লাফ দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবিম্বটি চলে গেল। সে জল পান করলো। তারপর কিছুক্ষন জলে সাঁতার কাটলো। আমি দেখছিলাম। আমি বুঝলাম ঈশ্বর আমাকে বার্তা পাঠিয়েছেন - সকল ভয় সত্ত্বেও সেখানে লাফ দিতে হবে। যখন আমি অপরিচিত কোন সীমানায় লাফ দিতে যাই, ঠিক একই রকম ভয় আমার মাঝেও কাজ করে। আমি তার খুব কিনারে যাই, দ্বিধান্বিত হই, তারপর ফিরে আসি। তখন আমার কুকুরটির কথা মনে হয়। যদি এক কুকুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেই পরিস্থিতিকে, কেন আমি নই? একদিন আমিও আমার অজানা ভয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার অজানা ভয় আমাকে পেছনে গেলে চলে গেল। সেই কুকুরটি হচ্ছে আমার দ্বিতীয় গুরু।
আমার তৃতীয় গুরু হচ্ছে এক ছোট্ট বালক। আমি একবার এক শহরে পৌঁছালাম। সেখানে দেখলাম এক ছোট্ট বালক একটি জ্বলন্ত মোমবাতি তার হাতের মধ্যে লুকিয়ে মসজিদের দিকে যাচ্ছে সেখানে সে বাতিটি রাখবে বলে। মজা করেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি নিজে বাতিটি জালিয়েছো?" সেই বালকটি বলল, "জ্বি, মহাশয়।" আমি তাকে আবার মজা করে বললাম, "তুমি কি বলতে পারো এই আলো কোথায় থেকে আসে? একটা সময় ছিল যখন মোমবাতিটি নেভানো ছিল, তারপর একটা সময় মোমবাতিটি জ্বালানো হলো, তুমি কি আমাকে বলতে পারো এই আলোর উৎস কোথায় যেখান থেকে এই আলোক ছড়ায়? তুমি যেহেতু এটি জ্বালিয়েছো তুমি নিঃশ্চয় বলতে পারবে এর সঠিক উত্তর।" বালকটি হেসে দিল, তারপর সে এক ফুঁ দিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, এখন তুমি দেখেছো আলো চলে গেল, কোথায় চলে গেল ? তুমি বলো। আমার অহং ধ্বংস হলো। সেই সাথে আমার জ্ঞানও হলো চূর্ণবিচূর্ণ। সেই মুহূর্তে আমি আমার নিজের অজ্ঞতা বুঝেছিলাম।
Osho: ”Secret of secrets“ অনুবাদ।
Comments
Post a Comment